বিশেষ প্রতিবেদন | ঢাকা
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক বৈষম্যের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন থেকে বঞ্চনা, পদোন্নতিতে দীর্ঘসূত্রতা এবং বাধ্যতামূলক অবসরের মতো একের পর এক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছিলেন বাংলাদেশ পুলিশের বর্তমান মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। দীর্ঘ কর্মজীবনে পেশাগত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও তাঁকে বছরের পর বছর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের বাইরে রাখা হয়েছিল বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। একপর্যায়ে সরকারি চাকরি থেকেই বিদায় নিতে হয় তাঁকে। অথচ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই কর্মকর্তাই ফিরে আসেন পুলিশ বাহিনীতে এবং শেষ পর্যন্ত অধিষ্ঠিত হন দেশের পুলিশ প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদে।
আলী হোসেন ফকিরের কর্মজীবনের এই উত্থান-পতন শুধু একজন পুলিশ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বিবরণ নয়; এটি বাংলাদেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক প্রভাব, পেশাগত বৈষম্য এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ককেও নতুন করে সামনে এনেছে।
১৯৯৫ সালের ১৫ নভেম্বর ১৫তম বিসিএসের মাধ্যমে সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশে যোগ দেন আলী হোসেন ফকির। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী এই কর্মকর্তা কর্মজীবনে নেত্রকোনা, ফেনী ও মাগুরা জেলার পুলিশ সুপার, ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার এবং আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। দেশের পাশাপাশি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে কসোভো ও আইভরি কোস্টেও দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তিনি।
কিন্তু দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও দায়িত্ব পালনের পরও তাঁর কর্মজীবন বাধাগ্রস্ত হয় বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। আওয়ামী লীগ শাসনামলে রাজনৈতিক কারণে একবার চাকরিচ্যুত হওয়ার পর পরবর্তী সময়ে তিনি চাকরি ফিরে পান। এরপরও তাঁর পেশাগত জীবনে স্বাভাবিক পদায়ন ও পদোন্নতির সুযোগ নিয়ে জটিলতা অব্যাহত থাকে।
২০১৩ সালের জানুয়ারিতে আইভরি কোস্টে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন শেষে দেশে ফেরেন আলী হোসেন ফকির। দেশে ফেরার পর তাঁকে রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়। সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এরপর দীর্ঘ সময় তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন ও প্রত্যাশিত পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত থাকেন। প্রায় এক দশক ধরে তাঁর কর্মজীবনের এই স্থবিরতা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনৈতিক বিবেচনা কাজ করেছিল কি না, সেই প্রশ্নের জন্ম দেয়।
পেশাগত জীবনের সবচেয়ে বড় আঘাত আসে ২০২২ সালের ১৬ নভেম্বর। সেদিন আওয়ামী লীগ সরকার তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায়। তখন তিনি আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন-৩-এর অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। সরকারি আদেশে জনস্বার্থের কথা বলা হলেও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাঁর অতীত রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের প্রসঙ্গ উঠে আসে। তবে বাধ্যতামূলক অবসরের প্রকৃত উদ্দেশ্য রাজনৈতিক ছিল কি না, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া যাচাই করা প্রয়োজন।
দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করা একজন কর্মকর্তাকে এভাবে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই তাঁর পেশাগত জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে রাজনৈতিক পরিচয়ের অভিযোগের সঙ্গে কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সম্পর্ক থাকার প্রশ্ন উঠলে তা শুধু একজন কর্মকর্তার প্রতি ন্যায়বিচারের বিষয় থাকে না; বরং পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসে। এর ধারাবাহিকতায় বিগত সময়ে চাকরিচ্যুত ও বঞ্চিত কর্মকর্তাদের পুনর্বহালের উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। ওই বছরের ২৭ আগস্ট চাকরিতে পুনর্বহাল হন আলী হোসেন ফকির। এরপর তিনি ডিআইজি পদে এবং ২০২৫ সালের আগস্টে অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি পান।
দীর্ঘদিনের পেশাগত অনিশ্চয়তা ও চাকরিচ্যুতির অধ্যায় পেরিয়ে তাঁর কর্মজীবনে আসে নতুন মোড়। ২০২৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি সরকার তাঁকে বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক হিসেবে নিয়োগ দেয়। পরদিন ২৫ ফেব্রুয়ারি তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একসময় যাঁকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছিল, সেই কর্মকর্তার পুলিশ বাহিনীর সর্বোচ্চ পদে ফিরে আসা প্রশাসনিক অঙ্গনে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।
তবে আলী হোসেন ফকিরের কর্মজীবনের এই ঘটনাপ্রবাহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে এনেছে। একজন কর্মকর্তা দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে দূরে থাকলে তাঁর পেশাগত যোগ্যতা ও দক্ষতার মূল্যায়ন কীভাবে করা হয়? পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনার অভিযোগ উঠলে তার নিরপেক্ষ তদন্তের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? আবার রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুনর্বহাল ও পদোন্নতির ক্ষেত্রেও কীভাবে স্বচ্ছতা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা যায়?
এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি। কারণ রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের শক্তি নির্ভর করে ব্যক্তির রাজনৈতিক আনুগত্যের ওপর নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের পেশাদারত্ব, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহির ওপর। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে পদায়ন এবং পদোন্নতি নিশ্চিত করা না গেলে তা বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও মনোবলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমানে আইজিপি হিসেবে আলী হোসেন ফকিরের সামনে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, পুলিশ বাহিনীর পেশাগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসনিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। অতীতে নিজে পেশাগত বঞ্চনার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর তাঁর নেতৃত্বে বাহিনীর অন্য কর্মকর্তাদের জন্য কতটা ন্যায়সংগত ও স্বচ্ছ পরিবেশ নিশ্চিত হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।
একজন পুলিশ কর্মকর্তার কর্মজীবনে চাকরিচ্যুতি, দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন না পাওয়া, বাধ্যতামূলক অবসর এবং পরবর্তী সময়ে সর্বোচ্চ পদে ফিরে আসার ঘটনা নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী।
আলী হোসেন ফকিরের কর্মজীবনের দীর্ঘ প্রতিকূলতা তাই নতুন করে মনে করিয়ে দেয়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে যোগ্যতা, সততা, দক্ষতা ও ন্যায়বিচারকে প্রাধান্য দেওয়া কতটা জরুরি।
ক্ষমতার পালাবদলে কর্মকর্তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের সংস্কৃতির পরিবর্তে এমন একটি পুলিশ প্রশাসন গড়ে তোলাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ, যেখানে কোনো কর্মকর্তা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অন্যায় সুবিধা পাবেন না, আবার বৈষম্যের শিকারও হবেন না।