পেশাদারিত্ব, সততা ও আধুনিকায়নের রূপকার: আইজিপি মোঃ আলী হোসেন ফকির-এর বর্ণাঢ্য খতিয়ান
ঢাকা: বাংলাদেশ পুলিশের ৩২তম মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মোঃ আলী হোসেন ফকির বিপিএম। ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে সরকারের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তিনি এই সর্বোচ্চ পদের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তিন দশকের দীর্ঘ ও গৌরবোজ্জ্বল কর্মজীবনে তিনি নিজেকে একজন অত্যন্ত চৌকস, দক্ষ এবং সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য সৎ পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
রাজনৈতিক বৈরিতা ও বাধ্যতামূলক অবসরের মতো চরম প্রতিকূলতা জয় করে পেশাদারিত্বের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানো এই শীর্ষ কর্মকর্তার শৈশব, শিক্ষাজীবন, সফল অভিযান ও ভিশনারি নেতৃত্বের এক বিস্তারিত খতিয়ান নিচে তুলে ধরা হলো: প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষাগত যোগ্যতা
মোঃ আলী হোসেন ফকির ৫ এপ্রিল ১৯৬৮ সালে বাগেরহাট জেলার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার শৈশব ও প্রাথমিক শিক্ষাজীবন কেটেছে নিজ জেলাতেই। পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ থেকে সাফল্যের সাথে বি কম (অনার্স) এবং এম কম (মাস্টার্স) ডিগ্রি অর্জন করেন। এছাড়াও তিনি ইনস্টিটিউট অব হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট (IPM) থেকে হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট (HRM) বিষয়ে পোস্টগ্রাজুয়েট ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেন, যা পরবর্তী সময়ে পুলিশ বাহিনী পরিচালনায় ও মানবসম্পদ উন্নয়নে তাকে দারুণভাবে সহায়তাকরে। কর্মজীবনের শুরু ও মাঠ পর্যায়ের সফল নেতৃত্ব
তিনি ১৯৯৫ সালে ১৫তম বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের মাধ্যমে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশে যোগদান করেন। মাঠ পর্যায়ে তার কাজের পরিধি ও দক্ষতা ছিল ব্যাপক:
* জেলা পুলিশ সুপার হিসেবে কঠোর অবস্থান: তিনি নেত্রকোনা, ফেনী এবং মাগুরা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সেই সময়ে এসব অঞ্চলের স্থানীয় সন্ত্রাসী ও চোরাকারবারিদের দমনে তিনি অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন ভূমিকা পালন করে সাধারণ মানুষের মনে আস্থা তৈরি করেন।
* কৌশলগত ইউনিটে নেতৃত্ব: ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) উপকমিশনার (ডিসি), রেঞ্জ রিজার্ভ ফোর্সের (আরআরএফ) সিলেটের কমান্ড্যান্ট এবং খুলনা ও ঢাকার বিভিন্ন এপিবিএন অধিনায়কের দায়িত্ব অত্যন্ত সফলভাবে সামলেছেন তিনি।
* এপিবিএন প্রধান হিসেবে আধুনিকায়ন: আইজিপি হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার ঠিক আগে তিনি আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অতিরিক্ত আইজিপি ও প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তার সুদৃঢ় কমান্ডের কারণে বিশেষায়িত এই ইউনিটের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও কৌশলগত অপারেশনের সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
আইজিপি হিসেবে সফল কর্মকাণ্ড ও দেশব্যাপী বিশেষ অভিযান
২০২৬ সালের শুরুতে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই আইজিপি মোঃ আলী হোসেন ফকির দেশজুড়ে অপরাধ দমন, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা এবং পুলিশি ব্যবস্থার আমূল সংস্কারে বেশ কিছু তাৎপর্যপূর্ণ ও প্রশংসনীয় অভিযান পরিচালনা করেছেন:
* চাঁদাবাজ ও অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় উচ্ছেদ: দায়িত্ব নিয়েই তিনি মাঠ পর্যায়ের পুলিশকে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে নির্দেশ দিয়েছেন যে, মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ কিংবা দখলদারদের আইনের আওতায় আনার ক্ষেত্রে কোনো দলীয় বা রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করা যাবে না। “অপরাধীর একমাত্র এবং প্রধান পরিচয় হলো সে একজন অপরাধী”—তার এই স্পষ্ট বার্তা মাঠপর্যায়ের প্রশাসনকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নির্ভীকভাবে কাজ করার শক্তি জুগিয়েছে।
* মহাসড়ক ও বাজারে চাঁদাবাজিবিরোধী টাস্কফোর্স: সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে তার নির্দেশে দেশব্যাপী বিশেষ টাস্কফোর্স অভিযান শুরু হয়। মহাসড়ক, কাঁচাবাজার ও গণপরিবহন খাতকে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত চাঁদাবাজি থেকে মুক্ত করতে এই অভিযান সফল ভূমিকা রাখে।
* ছিনতাই ও কিশোর গ্যাং নির্মূল অভিযান: ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের প্রধান প্রধান মহানগরে কিশোর অপরাধ এবং ছিনতাইকারীদের উৎপাত বন্ধে তিনি বিশেষ ব্লক রেইড এবং চিরুনি অভিযানের নির্দেশ দেন, যা নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
* মাঠ পরিদর্শন ও মানবিক পুলিশিং: তিনি কেবল দপ্তরে বসে নির্দেশ দেওয়ার নীতিতে বিশ্বাসী নন। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি) এবং খুলনা রেঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পুলিশ ফোর্স ও সাধারণ জনগণের সাথে সরাসরি বিশেষ কল্যাণ সভায় মিলিত হন। তিনি পুলিশকে পেশাদারিত্বের সাথে মানবিকতা ও সেবার মনোভাব নিয়ে কাজ করার আহ্বান জানান।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল ও উচ্চতর বৈশ্বিক প্রশিক্ষণ
আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষা এবং বিশ্বমানের আধুনিক পুলিশিং ব্যবস্থা সম্পর্কে আলী হোসেন ফকিরের রয়েছে অগাধ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা:
* জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন: বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় তিনি কসোভো এবং আইভরি কোস্ট-এ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ পুলিশের গৌরব বৃদ্ধি করেন।
* উচ্চতর বৈশ্বিক প্রশিক্ষণ: আধুনিক বিশ্বের সাইবার অপরাধ দমনে নিজেকে প্রস্তুত করতে তিনি যুক্তরাজ্য থেকে সাইবার সিকিউরিটি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ল এনফোর্সমেন্ট এজেন্সি থেকে ভিভিআইপি প্রোটেকশনসহ একাধিক আন্তর্জাতিক উচ্চতর প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন করেন।
প্রতিকূলতা জয় ও সততার অনন্য আখ্যান
মোঃ আলী হোসেন ফকিরের কর্মজীবন কেবল সফলতার নয়, বরং নৈতিকতা ও অটল দৃঢ়তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ২০২২ সালের ১৭ নভেম্বর তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাকে “জনস্বার্থে” বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছিল। দীর্ঘ সময় কোণঠাসা ও পদোন্নতি বঞ্চিত থাকলেও তিনি নিজের সততা ও আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। পরবর্তীতে ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাকে সসম্মানে চাকরিতে পুনর্বহাল করে। ২০২৬ সালের শুরুতে যোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা ও সম্পূর্ণ স্বচ্ছ (ক্লিন) ইমেজের কারণে তিনি বাহিনীর সর্বোচ্চ পদ আইজিপিতে সমাদৃত হন।
ভবিষ্যৎ সংস্কার পরিকল্পনা ও ভিশন
পুলিশ বাহিনীকে সম্পূর্ণ রাজনীতিমুক্ত, আধুনিক এবং জনগণের সত্যিকারের বন্ধু হিসেবে গড়ে তোলাই তার প্রধান ভিশন:
* ডিজিটাল ও আইটি বেইজড ইনভেস্টিগেশন: সাইবার সিকিউরিটিতে তার নিজস্ব দক্ষতা থাকায় তিনি দেশের প্রতিটি থানায় তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে আধুনিক অপরাধ তদন্ত ব্যবস্থার ব্যাপক সংস্কার হাতে নিয়েছেন。
* জনআস্থা পুনরুদ্ধার: তিনি বিশ্বাস করেন পুলিশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো মানুষের আস্থা অর্জন। জনগণের হারিয়ে যাওয়া বিশ্বাস ও আস্থা ফিরিয়ে আনতে তিনি অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ শুদ্ধি অভিযান জোরদার করেছেন।
মোঃ আলী হোসেন ফকিরের আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন বাংলাদেশ পুলিশের ইতিহাসে একটি ইতিবাচক ও গৌরবময় অধ্যায়। তার মাঠ পর্যায়ের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কাজের দক্ষতা, সৎ ইমেজ এবং প্রতিকূলতা জয়ের মানসিকতা পুলিশ বাহিনীকে একটি পেশাদার, স্বচ্ছ ও সত্যিকারের জনবান্ধব প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে।